স্বৈরাচারের দেওয়া বিজয় নয়, শিক্ষার্থীরা বেছে নিলেন শহিদ মীর মুগ্ধকে

আল মামুন, খুবি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকটি শুধু একটি প্রবেশপথ নয়, এটি এখন সময়ের সাক্ষী, স্মৃতির ধারক এবং তারুণ্যের প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল স্মারক। স্থপতির নকশায় এটি মূলত মহান মুক্তিযুদ্ধের আদলে তৈরি স্থাপনা হলেও, এর বর্তমান পরিচিতি জড়িয়ে আছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-এর এক মানবতাবাদী চরিত্র মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ-এর আত্মত্যাগের সঙ্গে। ‘বিজয় তোরণ’ নামে শুরু হওয়া এই স্থাপনা এখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ মীর মুগ্ধের নাম ধারণ করে চলেছে।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার উত্তরায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ডিসিপ্লিন থেকে স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থী মুগ্ধ। তাই তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই নাম প্রস্তাব করা হয়। মুগ্ধের বাড়ি ঢাকার উত্তরায়। সে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশন অর্থাৎ ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল-এ (বিইউপি) মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন।

‘ভাই, পানি লাগবে কারও? পানি!’ তাঁর এই শেষ কথাটিই মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মুগ্ধের এই মানবিকতা ও আত্মত্যাগ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে এক গভীর দাগ কাটে। সদ্য পতন হওয়া শাসকের ‘বিজয়’ নয়, শিক্ষার্থীরা তাদেরই সতীর্থের আত্মত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করতে চাইল।

ওই বছরের ১৭ আগস্ট প্রধান ফটকের সামনে ‘মুগ্ধ ভাই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে চিরকাল। সারা দেশের শহিদদের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না।’ এই ব্যানার টাঙিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি তোলেন।

শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফুর্ত দাবির প্রতি সম্মান জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সিন্ডিকেটের ২৩০তম সভায় তোরণটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শহিদ মীর মুগ্ধ তোরণ’ হিসেবে অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার গত বছরের ৯ মার্চ দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে নামফলক উন্মোচনের মাধ্যমে তিনি এ তোরণ উদ্বোধন করেন।

মুগ্ধ যখন শহিদ হন তার পাশেই সেই সময়ে অবস্থান করা তার বন্ধু জাকিরুল ইসলাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “এটি আমাদের জন্য বড়ো একটি পাওয়া। এই তোরণের মাধ্যমে পরবর্তীতে যারা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে পাশাপাশি যারা এখানে আসবে তাঁরা জানতে পারবে মুগ্ধ কে ছিলো কি তার পরিচয়। তাঁর দেশপ্রেম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যাবে। এছাড়াও আমি চাই দ্রুত মুগ্ধের খুনিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

মুগ্ধের জমজ ভাই মীর মাহফুজুর রহমান ¯িœগ্ধ বলেন, “খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মুগ্ধের কাছে অন্যতম পছন্দের একটি জায়গা ছিলো। আমি মনে করি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মুগ্ধকে যে সম্মান দিয়েছে তা আমার পরিবারসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ, আহত ও অংশগ্রহণকারী সকল যোদ্ধাদের জন্য বড়ো একটি প্রাপ্তি। এছাড়াও এই তোরণের কারণে মুগ্ধের সাহসিকতা আর দেশপ্রেম প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম রয়ে যাবে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।”

মুগ্ধের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম। তিনি বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অনেকগুলো ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা আছে। শহিদ মীর মুগ্ধ তোরণ আমার কাছে সেই আবেগের জায়গা। একটি ছেলে যার জীবন উৎসর্গের মধ্যে দিয়ে ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সেই স্মৃতি মনে পড়লে আমি স্তব্ধ হয়ে যায়, শরীরের ভিতর এখনো শিহরন কাজ করে। আমি ইতোমধ্যে মীর মুগ্ধ তোরণের পাশাপাশি নির্মাণাধীন টিএসসিতে মুগ্ধের স্মৃতি রক্ষণের জন্য অনেক আগেই ঘোষণা দিয়েছি। যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুগ্ধের মানবিকতার বাণী ছড়িয়ে পড়ে। সেটি শিক্ষার্থীদের সাথে পরামর্শ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়াও আমরা সবাই জানি জুলাইয়ের সেই মানবিক স্লোগান ‘পানি লাগবে পানি’ যা সবাইকে নিমেষেই মানবিক করে তোলে। আমরা ইতোমধ্যে মুগ্ধের নামে অনেকগুলো পানি কর্নার করেছি। এছাড়াও আমরা প্রতিটি এডমিশন টেস্টে মুগ্ধের নামে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ফ্রেশ পানি বিতরণ করে থাকি। আমরা সব সময় মুগ্ধকে স্মরণ করতে চাই।”

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন